০৯:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে বসতঘর সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সরে যাচ্ছে

নদীর ধারে বাস, ভাবনা যেন বারো মাস। তবে বর্ষা মৌসুমে ভাবনা রূপ নেয় ভয়ের। বর্ষাকালিন বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠে নদীর বুক। শান্ত স্বভাব ছেড়ে তাকে যেন পেয়ে বসে ধ্বংসের নেশা। সেরকমই অঝোর ধারায় ফুঁসছে নীলফামারী অংশের তিস্তা নদী। সেইসঙ্গে নদী ডানদিকে সরে এসে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। গ্রাস করছে ফসলি জমি, বসতভিটা। বসতঘর বাঁচাতে ঘর ভেঙে নিরাপদে সরে যাচ্ছে অনেক পরিবার।

বুধবার(২২ জুলাই) এমনি চিত্র দেখা গেলো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা ও খালিশা চাঁপানি ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামে।

বিগত বছরেও পাড় ভাঙতে ভাঙতে নদী অনেকটাই চওড়া হয়েছে। আরও কাছাকাছি চলে এসেছে লোকালয়ে। ফলে এবার বর্ষায় বিপদের মুখে পড়েছে ওই গ্রামগুলি।

অপরদিকে ঝুনাগাছ চাপানীর ছাতুনামা এলাকায় নির্মিত ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ (মুজিব কিল্লা) সেটিও এখন হুমকীর মুখে বলে জানান আশ্রয়কেন্দ্র-সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, আফসার আলী ও আব্দুল আজিজ।

বুধবার দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের উপসহকারি প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম। তিনি জানান, ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ, কাঠ ও গাছের গুড়ি ফেলে ভাঙন রোধের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ওই সকল এলাকায় নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর ডান তীর সরে আসায় এই ভাঙন দেখা দেয়।

বাপাউবো ডালিয়া ডিভিশনের সুত্র মতে, বুধবার সকালে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপ নুরুল ইসলাম জানান, বুধবার(২২ জুলাই) বিকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি কমে বিপৎসীমার(৫২.১৫) ১৭ সেন্টিমিটার(৫১.৯৮) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার(৫২.১৪) এবং দুপুর ৩টায় ১২ সেন্টিমিটার(৫২.০৩) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য আরও বলছে, গত এক মাসে চার দফা তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও তা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মধ্যে আবার নেমে আসে। কিন্তু পানির উচ্চতা বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ার পরও তিস্তাপাড়ের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, কৃষিজমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত অবস্থায় ছিল।

বিশেষজ্ঞ, পাউবো কর্মকর্তা ও নদীপাড়ের মানুষের অভিন্ন মত- নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি ও বালুই এর মূল কারণ। এতে তিস্তা তার স্বাভাবিক গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে নদী অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না; অল্প পানিতেই তা দুই তীর উপচে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে- ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের জলকপাট খুলে দিলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলি একসঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই পলি নদীর তলদেশে জমে তিস্তাকে আরও অগভীর করে তুলছে।

ডালিয়া পাউবোর তথ্য মতে, চলতি বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদী ছয় দফায় বৃদ্ধি পায়। প্রথমদফায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে ২৩ জুন। সেসময় বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এরপর পানি নেমে যায়। দ্বিতীয় দফায় ২৮ জুন বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছিল। যার ১২ ঘন্টা পর পানি কমে বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। এরপর তৃতীয় দফায় গত ৭ জুলাই রাত ৮টার দিকে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। চতুর্থ দফায় গত ৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার(৫২.১৮) ওপর দিয়ে ও পঞ্চম দফায় গত ১৩ জুলাই বিকাল ৬টায় তিস্তা নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করে ৩ সেন্টিমিটার(৫২.১৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সেদিন রাত ১০টায় বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার(৫২.২৫) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়; যা ১৫ ঘন্টা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ১৪ আগষ্ট দুপুর ১২টার দিকে নেমে আসে। সবশেষ ষষ্ঠ দফায় ২০ জুলাই বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুসারে, বাংলাদেশ অংশে ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীটি নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে চিলমারি নদী বন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি এই তিস্তা নদী।

খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, চলতি বর্ষায় সামান্য পানি বাড়লেই তিস্তা নদীর দুই তীর উপচে তা ঢুকে পড়ছে চরাঞ্চল, নিম্নাঞ্চল ও লোকালয়ে। অথচ অনেক সময় নদীর পানি বিপৎসীমার নিচেই থাকে। সেখানে আজকে (বুধবার) তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হলেও এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়।

ঝুনাগাছ চাপানী ছাতুনামা গ্রামের আল-আমিন জানান, ভারী বৃস্টিপাতে উজানের নদ-নদীর পানি ধেয়ে আসায় তিস্তা নদী রিতিমত গর্জে উঠেছে। গত ১৩ জুলাই বিপৎসীমার অতিক্রম করার পর থেকে পানি বাড়া-কমার মধ্যে চলছিল। ফলে নিম্নাঞ্চলে যে পানি প্রবেশ করেছিল তা এখনও নামেনি। বুধবার সকালে পানি আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকায় ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে নদী পাড়ের বসবাসকৃত মানুষরা ঘরবাড়ি তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। আল-আমিন আরও জানায়, তিস্তা নদীর প্রচন্ড স্রোতে সেখানে নৌকা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অসংখ্য ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে পড়ে পরিবারগুলো নিরাপদে সরে যাচ্ছে।

এদিকে ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ফরেস্টের চর সহ ওই এলাকায় বুধবার ভোর রাতে তিস্তা নদী হঠাৎ করে ডান দিকে সরে এসে প্রবাহিত হতে থাকে। ওই এলাকার আমিনুর রহমান জানান, যে তিস্তা নদীর ডান তীর থেকে নদীর প্রবাহ ছিল দুই হাজার ফিট দূরে। সেই নদী হুট করে ৫০ ফিটের কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে ছাতুনামা কেল্লাপাড়া ইতোমধ্যে ৭টি পরিবারের বসতঘর ভেঙ্গে নিরাপদে সরে গেছে। অনেকে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নিরাপদে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই এলাকায় স্লাইকোন সেন্টারটি হুমকির মুখে পড়েছে।

ডিমলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০২২ সালের জানুয়ারী মাসে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা নামক স্থানে ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ (মুজিব কিল্লা) নামের আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। প্রায় দুই কোটি টাকায় কাজটি বাস্তবায়ন করেছিল মেসার্স হায়দার এন্ড কোং নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। একই বছরের ১৩ অক্টোবর এটি হস্তান্তর করা হয়। কেন্দ্রটি ছাতুনামা গ্রামে পাঁচ বিঘা (১৫০ শতাংশ) জমির ওপরে নির্মিত। ওই সময় কেন্দ্রটি থেকে তিস্তা নদীর দুরত্ব ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ফিট। এখন নদী সাইক্লোন সেল্টার কেন্দ্রটির ৫০ ফিটেরও কম দূরত্বে চলে এসেছে। নদীর ভাঙন রোধ করা না গেলে সাইক্লোন কেন্দ্রটি নদীতে বিলিন হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর হোসেন জানান, এত টাকা ব্যয়ে তৈরি করা সাইক্লোন কেন্দ্রটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনও কাজে আসছে না। এটি নির্মানের পর থেকে সেখানে যাতায়াতের কোনও রাস্তাই তৈরি করে দেওয়া হয়নি। জমির আইলবাড়ি হলো রাস্তা। এই সাইক্লোন কেন্দ্রটি এখন তিস্তা নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে। এটি নির্মানের পর সেখানে কোনো পরিবার নিরাপদে একটি রাতও কাটাতে পারেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী জানান, আমার এলাকায় তিস্তা নদীর ছাতুনামা, কেল্লাপাড়ায় ভাঙন সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করেছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, তিস্তার ডান তীরে হঠাৎ করে নদী সরে এসে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা ভাঙন রোধের প্রস্তুতি নিয়েছি।

ডিমলা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুজ্জামান জানান, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

উজানে নীলফামারীর তিস্তাপাড়ে ভেসে আসলো ৭ ফুট অজগর সাপ

তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে বসতঘর সঙ্গে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সরে যাচ্ছে

প্রকাশিত ০৫:৫৭:২৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

নদীর ধারে বাস, ভাবনা যেন বারো মাস। তবে বর্ষা মৌসুমে ভাবনা রূপ নেয় ভয়ের। বর্ষাকালিন বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠে নদীর বুক। শান্ত স্বভাব ছেড়ে তাকে যেন পেয়ে বসে ধ্বংসের নেশা। সেরকমই অঝোর ধারায় ফুঁসছে নীলফামারী অংশের তিস্তা নদী। সেইসঙ্গে নদী ডানদিকে সরে এসে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। গ্রাস করছে ফসলি জমি, বসতভিটা। বসতঘর বাঁচাতে ঘর ভেঙে নিরাপদে সরে যাচ্ছে অনেক পরিবার।

বুধবার(২২ জুলাই) এমনি চিত্র দেখা গেলো নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের কেল্লাপাড়া, ছাতুনামা ও খালিশা চাঁপানি ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামে।

বিগত বছরেও পাড় ভাঙতে ভাঙতে নদী অনেকটাই চওড়া হয়েছে। আরও কাছাকাছি চলে এসেছে লোকালয়ে। ফলে এবার বর্ষায় বিপদের মুখে পড়েছে ওই গ্রামগুলি।

অপরদিকে ঝুনাগাছ চাপানীর ছাতুনামা এলাকায় নির্মিত ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ (মুজিব কিল্লা) সেটিও এখন হুমকীর মুখে বলে জানান আশ্রয়কেন্দ্র-সংলগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, আফসার আলী ও আব্দুল আজিজ।

বুধবার দুপুরে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করতে দেখা গিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের উপসহকারি প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম। তিনি জানান, ভাঙন এলাকায় জিও ব্যাগ, কাঠ ও গাছের গুড়ি ফেলে ভাঙন রোধের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ওই সকল এলাকায় নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর ডান তীর সরে আসায় এই ভাঙন দেখা দেয়।

বাপাউবো ডালিয়া ডিভিশনের সুত্র মতে, বুধবার সকালে তিস্তার পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

পাউবো ডালিয়া ডিভিশনের তিস্তা নদীর পানি পরিমাপ নুরুল ইসলাম জানান, বুধবার(২২ জুলাই) বিকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি কমে বিপৎসীমার(৫২.১৫) ১৭ সেন্টিমিটার(৫১.৯৮) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার(৫২.১৪) এবং দুপুর ৩টায় ১২ সেন্টিমিটার(৫২.০৩) নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য আরও বলছে, গত এক মাসে চার দফা তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও তা ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মধ্যে আবার নেমে আসে। কিন্তু পানির উচ্চতা বিপৎসীমার নিচে নেমে যাওয়ার পরও তিস্তাপাড়ের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, কৃষিজমি, বসতভিটা ও গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত অবস্থায় ছিল।

বিশেষজ্ঞ, পাউবো কর্মকর্তা ও নদীপাড়ের মানুষের অভিন্ন মত- নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পলি ও বালুই এর মূল কারণ। এতে তিস্তা তার স্বাভাবিক গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে নদী অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না; অল্প পানিতেই তা দুই তীর উপচে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের মতে- ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের জলকপাট খুলে দিলে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলি একসঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেই পলি নদীর তলদেশে জমে তিস্তাকে আরও অগভীর করে তুলছে।

ডালিয়া পাউবোর তথ্য মতে, চলতি বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদী ছয় দফায় বৃদ্ধি পায়। প্রথমদফায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে ২৩ জুন। সেসময় বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এরপর পানি নেমে যায়। দ্বিতীয় দফায় ২৮ জুন বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহিত হয়েছিল। যার ১২ ঘন্টা পর পানি কমে বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে। এরপর তৃতীয় দফায় গত ৭ জুলাই রাত ৮টার দিকে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। চতুর্থ দফায় গত ৯ জুলাই রাত ৯টার দিকে বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার(৫২.১৮) ওপর দিয়ে ও পঞ্চম দফায় গত ১৩ জুলাই বিকাল ৬টায় তিস্তা নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করে ৩ সেন্টিমিটার(৫২.১৮) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সেদিন রাত ১০টায় বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার(৫২.২৫) ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়; যা ১৫ ঘন্টা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ১৪ আগষ্ট দুপুর ১২টার দিকে নেমে আসে। সবশেষ ষষ্ঠ দফায় ২০ জুলাই বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুসারে, বাংলাদেশ অংশে ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদী লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত নদীটি নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে চিলমারি নদী বন্দরের দক্ষিণে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, মৎস্যসম্পদ, নৌ-যোগাযোগ ও জীবিকার অন্যতম ভিত্তি এই তিস্তা নদী।

খালিশা চাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ জানান, চলতি বর্ষায় সামান্য পানি বাড়লেই তিস্তা নদীর দুই তীর উপচে তা ঢুকে পড়ছে চরাঞ্চল, নিম্নাঞ্চল ও লোকালয়ে। অথচ অনেক সময় নদীর পানি বিপৎসীমার নিচেই থাকে। সেখানে আজকে (বুধবার) তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হলেও এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়।

ঝুনাগাছ চাপানী ছাতুনামা গ্রামের আল-আমিন জানান, ভারী বৃস্টিপাতে উজানের নদ-নদীর পানি ধেয়ে আসায় তিস্তা নদী রিতিমত গর্জে উঠেছে। গত ১৩ জুলাই বিপৎসীমার অতিক্রম করার পর থেকে পানি বাড়া-কমার মধ্যে চলছিল। ফলে নিম্নাঞ্চলে যে পানি প্রবেশ করেছিল তা এখনও নামেনি। বুধবার সকালে পানি আবার বৃদ্ধি পাওয়ায় এলাকায় ব্যাপক ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এতে নদী পাড়ের বসবাসকৃত মানুষরা ঘরবাড়ি তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। আল-আমিন আরও জানায়, তিস্তা নদীর প্রচন্ড স্রোতে সেখানে নৌকা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অসংখ্য ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে পড়ে পরিবারগুলো নিরাপদে সরে যাচ্ছে।

এদিকে ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ফরেস্টের চর সহ ওই এলাকায় বুধবার ভোর রাতে তিস্তা নদী হঠাৎ করে ডান দিকে সরে এসে প্রবাহিত হতে থাকে। ওই এলাকার আমিনুর রহমান জানান, যে তিস্তা নদীর ডান তীর থেকে নদীর প্রবাহ ছিল দুই হাজার ফিট দূরে। সেই নদী হুট করে ৫০ ফিটের কাছাকাছি চলে এসেছে। এতে ছাতুনামা কেল্লাপাড়া ইতোমধ্যে ৭টি পরিবারের বসতঘর ভেঙ্গে নিরাপদে সরে গেছে। অনেকে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে নিরাপদে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনি আরও জানান, ওই এলাকায় স্লাইকোন সেন্টারটি হুমকির মুখে পড়েছে।

ডিমলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২০২২ সালের জানুয়ারী মাসে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ছাতুনামা নামক স্থানে ‘সাইক্লোন সেল্টার সেন্টার’ (মুজিব কিল্লা) নামের আশ্রয়কেন্দ্রটি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। প্রায় দুই কোটি টাকায় কাজটি বাস্তবায়ন করেছিল মেসার্স হায়দার এন্ড কোং নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। একই বছরের ১৩ অক্টোবর এটি হস্তান্তর করা হয়। কেন্দ্রটি ছাতুনামা গ্রামে পাঁচ বিঘা (১৫০ শতাংশ) জমির ওপরে নির্মিত। ওই সময় কেন্দ্রটি থেকে তিস্তা নদীর দুরত্ব ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ফিট। এখন নদী সাইক্লোন সেল্টার কেন্দ্রটির ৫০ ফিটেরও কম দূরত্বে চলে এসেছে। নদীর ভাঙন রোধ করা না গেলে সাইক্লোন কেন্দ্রটি নদীতে বিলিন হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নুর হোসেন জানান, এত টাকা ব্যয়ে তৈরি করা সাইক্লোন কেন্দ্রটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কোনও কাজে আসছে না। এটি নির্মানের পর থেকে সেখানে যাতায়াতের কোনও রাস্তাই তৈরি করে দেওয়া হয়নি। জমির আইলবাড়ি হলো রাস্তা। এই সাইক্লোন কেন্দ্রটি এখন তিস্তা নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে। এটি নির্মানের পর সেখানে কোনো পরিবার নিরাপদে একটি রাতও কাটাতে পারেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক চৌধুরী জানান, আমার এলাকায় তিস্তা নদীর ছাতুনামা, কেল্লাপাড়ায় ভাঙন সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করেছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, তিস্তার ডান তীরে হঠাৎ করে নদী সরে এসে ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। আমরা ভাঙন রোধের প্রস্তুতি নিয়েছি।

ডিমলা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুজ্জামান জানান, তিস্তা নদীর ভাঙন রোধে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলেছি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।