নীলফামারীর সৈয়দপুরে অটোযাত্রীকে চেতনা নাশক দিয়ে অজ্ঞান করে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি। না পেয়ে ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে জখম করেছে অটোরিকশা চালকবেশী সংঘবদ্ধ চক্র। কৌশলে পালিয়ে এসে এক রিকশা চালকের সহায়তায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে তরুণ রেজওয়ান উল্লাহ (১৮)।
ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ৯ টার দিকে সৈয়দপুর শহরের ওয়াপদা মোড় এলাকায়। আহত তরুণ রেজওয়ান উল্লাহ সৈয়দপুর উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের শ্বাষকান্দর তালতলাপাড়া গ্রামের রিকশা চালক মোশাররফ হোসেনের ছেলে। সে পেশায় একজন টাইলস ফিটিংস কর্মী। সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের সার্জারীতে চিকিৎসাধীন।
বুধবার (২২ জুলাই) বেলা সাড়ে ১২ টায় হাসপাতালে গেলে রেজওয়ান উল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমার নষ্ট মোবাইল ঠিক করতে সৈয়দপুর প্লাজা সুপার মার্কেটে যাচ্ছিলাম। পথে ছোট রেলঘুমটিতে পৌঁছামাত্র আমার বাবা মোবাইল করে। তিনি আমার কাছে থাকা টাকা তাকে দ্রæত পৌঁছে দিতে শহরের দিনাজপুর রোডের নাটোর দইঘর এলাকায় যেতে বলেন।
এতে নাটোর দইঘর যাওয়ার জন্য রেলঘুমটিতে একটা অটো রিকশায় উঠি। এমন সময় আরো একজন ড্রাইভারের পাশে এসে বসেন এবং রিকশা শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের দিকে না গিয়ে থানার দিকে যেতে থাকে। ফলে রিকশা চালককে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় অপর যাত্রীকে থানার সামনে নামিয়ে দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আমরা দিনাজপুর রোডে যাবো। তাই আর কিছু বলিনি।
কিন্তু থানায় যাওয়ার আগেই আরেকজন মাস্কপড়া ব্যক্তি চলন্ত অবস্থায় আমার পাশে উঠে বসে এবং কিছু একটা নাকের কাছে ধরে। এতে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে জ্ঞান ফিরলে বুঝতে পারি আমাকে একটা ঘরে আটকে রাখা হয়েছে এবং ৩ জন অস্ত্র হাতে আমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় আছে। আমি চোখ মেলতেই তারা আমাকে জাপ্ট ধরে এবং আমাকে বাড়িতে মোবাইল করে ১ লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলে।
আমি কৌশল করে বলি, আমার বাবা মা নাই, ইয়াতিম ও গরীব। তাই মোবাইল করলেও কেউ আসবেনা। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বাম হাতে চাকু দিয়ে আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাদের অনুনয় বিনয় করলেও তারা বেধড়ক মারপিট করে। এক পর্যায়ে পেটের বাম পাশে চাকু ঢুকিয়ে দেয়। তখন অবস্থা বেগতিক দেখে প্রচন্ড শক্তির সাথে ডান হাত দিয়ে সজোরে ধাক্কা মারলে তারা পড়ে যায়। এই সুযোগে দরজা খুলে বের হই।
অন্ধকারে কিছু বুঝতে না পেরে শুধু আলোর দিকে দৌড় দেই। এতে সৈয়দপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের ওয়াপদা মোড় থেকে রেলগেট এর মাঝামাঝি স্থানে এসে পড়ে যাই। এসময় অনেককেই আমার পাশ দিয়ে যেতে দেখে সাহায্য চাই। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। প্রায় ১৫-২০ মিনিট গুরুত্বর জখম অবস্থায় সজ্ঞান থাকার পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে নিস্তেজ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।
হাসপাতালে চিকিৎসাকালে জ্ঞান ফিরে জানতে পারি মিস্ত্রিপাড়ার রিকশা চালক আব্দুল মজিদ চাচা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনেছেন এবং আমার বাবাকে মোবাইল করে জানিয়েছেন। খবর পেয়ে বাড়ির লোকজন আসে। রাতে থানা থেকে পুলিশ এসে দেখে গেছে। থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করার জন্য বলেছেন। তবে আমাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এখন পর্যন্ত থানায় যাওয়া হয়নি।
উদ্ধারকারী রিকশা চালক আব্দুল মজিদ বলেন, বসুনিয়া পাড়া মোড় থেকে যাত্রী নিয়ে ওয়াপদা মোড় যাওয়ার পথে রেলগেট পার হয়ে একটু আগাতেই সড়কের পাশে বড় বিলবোর্ডের নিচে ছেলেটাকে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান অবস্থায় দেখতে পাই। কাছে গিয়ে চিনতে পেরে যাত্রীকে সেখানেই নামিয়ে দিয়ে তাকে একাই রিকশায় তুলে হাসপাতালে নিয়ে আসি এবং ওর বাবাকে মোবাইল করি।
রেজওয়ান উল্লাহর বাবা মোশাররফ হোসেন বলেন, এটা সংঘবদ্ধ ছিনতাই ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের অপকর্ম। তারা রিকশা ও অটো চালকের বেশে ওতপেতে থেকে সুযোগ বুঝে মানুষকে অজ্ঞান করে আটকে জিম্মি করে। ইতোপূর্বে অনেকে এদের শিকার হয়েছেন। ওরা আমার ছেলেকেও আটকে ১ লাখ টাকা নিতে চেয়েছিল। না পেয়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে।
তিনি আরও বলেন, কৌশলে আমার ছেলে পালিয়ে বাঁচলেও তার কাছে থাকা মোবাইল ও ১২ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা এবিষয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা আশা করি। জড়িতদের সনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত বিচার দাবী করছি। তা না হলে এই অশুভ চক্রের খপ্পরে আরও অনেকে সর্বশান্ত হওয়াসহ প্রাণ নাশের আশঙ্কা আছে। আমরা গরীব মানুষ রিকশা চালিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, গতরাতে মারাত্মক কাটা জখম ও রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলেটা হাসপাতালে আসে। তার আঘাত খুবই গুরুতর হওয়ায় ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তার হাত পেটের কাটাস্থানে মোট ২০ টি সেলাই দিতে হয়েছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হবে।
সৈয়দপুর থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল করিম রেজা বলেন, জখম অবস্থায় তরুণ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক সুরতহাল তদন্ত করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ করার পর আরও গুরুত্ব সহকারে বিষয়টা দেখা হবে। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনার পেছনে ক্যাসিনো জুয়া নিয়ে বিরোধ রয়েছে। আমরা সেই বিষয়েও খতিয়ে দেখছি। ঘটনার সাথে জড়িত অপরাধী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবেনা।
এদিকে সচেতন মহলের অভিযোগ স¤প্রতি সৈয়দপুরে অপরাধ কর্মকাÐ বেড়েছে। প্রশাসনের গাফিলতির কারনেই দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। তারা পুলিশকে আরও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার জন্য অভিমত ব্যক্ত করেন। আর এর দৃষ্টান্ত হিসেবে সর্বশেষ সংঘটিত এই অজ্ঞান করে অপহরণ ও মুক্তিপণ না পেয়ে ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত জখম করার যথার্থ ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়েছেন।























