আওয়ামীলীগের ঠিকাদারদের পূনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এমন অভিযোগে একজন বিএনপি নেতার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর থেকে তোলপাড় চলছে।
এই অভিযোগে সম্প্রতি তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে ডিএস এর বিষয়ে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতা। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই ডিএস এখানে কর্মরত থাকলে রেলওয়ে কারখানার উন্নয়ন চরমভাবে ব্যহত হবে এবং রেলওয়েকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সামসুল আলম বলেন, ডিএস শাহ সুফি নুর মোহাম্মদ নিজেকে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ হিসেবে বিএনপিপন্থী পরিচয় দিয়ে থাকেন। এটা তার একটা অপকৌশল। কারণ মূলত: তিনি আওয়ামী লীগের দোসর। এজন্যই ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পরও তিনি চিহ্নিত আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারকে দিয়ে এখনো সব কাজ করছেন।
এমনকি সাবেক রেল মন্ত্রীর ভাতিজার সাথে সখ্যতা বজায় রেখে তার মাধ্যমে বিশাল অংকের ঠিকাদারী কাজ বিগত ১৭ বছর লুটেপুটে খাওয়া আওয়ামীপন্থীদের দিয়েছেন। যা এখনও অব্যাহত আছে। মোটা অংকের কমিশনের মাধ্যমে তিনি এই আওয়ামী পূনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি ওই ভাতিজাসহ ফরিদপুরের এক ঠিকাদার নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লোক পরিচয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় আসেন। কারখানার ডিএস নিজে অফিস থেকে বের হয়ে এসে গেটে তাকে রিসিভ করেন। কিন্তু সেদিন রেলওয়ে শ্রমিক কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিনিধি নির্বাচন থাকায় কারখানার ভিতরে না নিয়ে গেটের সামনে রেলওয়ে ওয়েলফেয়ার অফিসে বসে গোপনে মিটিং করেন।
যা জানতে পেরে শ্রমিকরাসহ বিএনপি ও জামায়াত নেতারা এসে ওই অফিসে তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলেন। এসময় সাবেক রেলমন্ত্রীর ভাতিজা কৌশলে পালিয়ে যায়। পরে জেরার মুখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লোক পরিচয় দানকারী ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়। তারপরও নেতৃবৃন্দ থানায় খবর দিলে পুলিশ এসে তাকে আটক করে নিয়ে যায়।
সামসুল আলম বলেন, ডিএস এখনো চিহ্নিত আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদের ছোট বড় সব কাজ ডেকে ডেকে দেন। অথচ আমরা বার বার ধর্ণা দিয়েও কোন কাজ পাচ্ছিনা। কিন্তু যোগ্যতা ও দক্ষতার দিক দিয়ে আমরা কোন অংশে কম না। তারপরও দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করে চলেছে।
তিনি আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর বিগত ২ বছরে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় অনেক উন্নয়ন কাজ হয়েছে। এসব কাজের শতভাগই আগের সেই দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদেরকেই দেওয়া হয়েছে। যারা দীর্ঘ ১৭ বছর লুটেপুটে খেয়েছে রেলওয়ে সেক্টরকে। আর্থিক সুবিধা নিয়ে ডিএস তাদের এখনো কাজ দিয়ে যাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন থেকে ওই ঠিকাদাররা কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে কাজ না করেই হাতিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার কোটি টাকা। এমনকি যন্ত্রাংশ সরবরাহের টেন্ডার নিয়ে কোন প্রকার মালামাল না দিয়েই সম্পূর্ণ অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে আত্মসাৎ করেছেন। আমরা নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টের এই ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের বিলুপ্তি চাই। নয়তো আগামীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রেলওয়েকে নিয়ে যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এখনো সেই দূর্নীতিবাজ ঠিকাদারদের দাপট চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। তাই এই আওয়ামী দরদী ডিএস কে দ্রুত অপসারণ করে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা তথা বাংলাদেশ রেলওয়েকে ক্ষতির মুখ থেকে রক্ষার দাবি জানান তিনি। একই দাবি জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ঠিকাদারও৷ এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
সৈয়দপুর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শেখ বাবলু বলেন, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা পুরো বাংলাদেশের রেলওয়ের প্রাণ। এখানে এখনো আওয়ামী লীগের ঠিকাদাররা দাপটের সাথে কাজ করছেন এবং তাদেরকে সহযোগিতা করছেন কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস)। যা মেনে নেওয়া যায়না। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।
জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম এ পারভেজ লিটনও একই রকম মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছেও তথ্য আছে ডিএস এখনো আওয়ামী আমলের ঠিকাদার দিয়েই সব কাজ করাচ্ছেন। রেলওয়ের সব কাজেই তাদেরকেই দেখা যাচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানাই।
সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ সভাপতি এ্যাড. এস এম ওবায়দুর রহমান বলেন, বিভিন্ন মাধ্যমে ডিএস এর নানা অনিয়ম দূর্নীতির খবর পাই। তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেন এবং অর্থের বিনিময়ে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ (টিএলআর) দিয়ে থাকেন। এসব অভিযোগ তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার বলেন, রেলওয়ে শ্রমিক কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিনিধি নির্বাচনের দিন ডিএস এর সাথে দুই-তিন জন আওয়ামী লীগের ঠিকাদার দেখা করতে এসেছিল। তারা মূলত: কাজ পেতে লবিং করার জন্য আসেন। উপস্থিত লোকজন তাদের সাথে গোপন মিটিং করার সময় ওই ঠিকাদারকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। আমার প্রশ্ন হলো ডিএস কেনো এখনো তাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন?
বরং তিনি নিরপেক্ষ থেকে সরকারের কাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করবেন। অথচ এমন ঘটনা উল্টো নির্দেশ দিচ্ছে। এটা কখনোই কাম্য নয়। সরাসরি কেউ ডিএস এর অনিয়ম দূর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে আসেনি। তবে নানাভাবে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা তদন্ত প্রয়োজন। সরকারের উন্নয়ন কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় বা দূর্নীতির কারণে সুনাম ক্ষুন্ন হয় তা প্রতিহত করতে আমরা বদ্ধ পরিকর।
এব্যাপারে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্ম ব্যবস্থাপক মো. মমতাজুল হক বলেন, কোন কাজ কোন আওয়ামী ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে। তাহলে অভিযোগ সঠিক বলে প্রমাণিত হবে। নয়তো এসব উড়ো প্রোপাগান্ডা মাত্র। কারণ এখন সব টেন্ডার অনলাইন। তাই ইচ্ছে মাফিক কাউকে কাজ দেওয়ার সুযোগ নাই।
বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নুর মোহাম্মদ বলেন, আমি ইজিপির মাধ্যমে টেন্ডার দিয়েছি। তাতে যে প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পেয়েছেন তারাই কাজ করছেন। এখানে আওয়ামী লীগ বা অন্য দল কে কাজ দেওয়ার ইখতিয়ার আমার নাই। অতএব এসব অভিযোগ সঠিক নয়। শেষে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন সম্প্রতি বিএনপি ও অন্যান্য দলকেও কাজ দেওয়া হয়েছে।
নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য হাফেজ মাওলানা আব্দুল মুনতাকিম বলেন, বিভাগীয় তত্বাবধায়ক মূলত: আমাদের সৈয়দপুর রেলওয়ের অভিভাবক। তিনি নিয়ম মাফিক কাজ করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এর ব্যত্যয় ঘটলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ তথা প্রশাসন আছে। তারা তদন্ত করে অনিয়ম বা দূর্নীতি পাইলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) ফকির মহিউদ্দিন মুঠোফোনে সাংবাদিকদের বলেন, অভিযোগের পয়েন্টগুলো আমি নোট করে রাখছি। আমাদের সোর্সে তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই বিভাগীয় ভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।














