নীলফামারীর সৈয়দপুর বিসিক শিল্প নগরীর একটি শীলগালাকৃত গোডাউন থেকে প্রশাসনের জব্দকৃত ২ কোটি টাকা মূল্যের ৯৯ মেট্রিক টন নিষিদ্ধ কীটনাশক উধাও হয়ে গেছে। আর এই মালামালের দেখভালের দায়িত্বে থাকা শিল্পনগরী কর্মকর্তা, কৃষি কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসন কেউ কিছু জানেননা।
এমনকি মালগুলোর মালিক ও গোডাউন মালিকও নাকি এ বিষয়ে বেখবর। এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনা উম্মোচিত হয়েছে গতকাল বুধবার (২৯ জুলাই) বিকেলে আদালতের নির্দেশে ওই নিষিদ্ধ মালামাল পুুড়িয়ে ধ্বংস করার জন্য ম্যাজিষ্ট্রেট আসার পর বিষয়টি ধরা পড়ে।
জানা যায়, বিগত ২০২৪ সালের ২৫ জুন বিসিক শিল্প নগরীর ওই গোডাউন থেকে এসিআই কোম্পানীর সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত বালাই নাশক বিফার-৫ জি সরিয়ে ফেলার সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট এর নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা অভিযান চালায়। এসময় ওই গোডাউনে থাকা ৯৯ মেট্রিক টন মাল জব্দ করে গোডাউনটি শীলগালা করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার জিম্মায় চাবি দেওয়া হয়। আর গোডাউন তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয় শিল্পনগরী কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনকে।
সেই সাথে এই ঘটনার প্রেক্ষিতে নিয়মিত মামলা দায়ের করে মালগুলোর মালিককে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ২ বছর ধরে ওই মামলা নীলফামারী বিশেষ আদালতে চলমান। সম্প্রতি আদালত নির্দেশ দেন নিষিদ্ধ ওই বালাইনাশকগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করার। সে অনুযায়ী গতকাল বুধবার নীলফামারী জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মাহমুদুল হাসান সৈয়দপুর থানা পুলিশের সহায়তায় বিসিক শিল্পনগরীতে আসেন।
শিল্পনগরী কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে শীলগালাকৃত গোডাউন খুলে হতভম্ব হয়ে পড়েন। সেখানে কয়েকটি কাগজের কার্টুনসহ মাত্র ১২৩ টি বালাইনাশকের প্যাকেট পাওয়া যায়। যেগুলো ছেড়া-ফাটা ও ইদুরে কাটা। পুড়ো গোডাউন ফাঁকা। এত বিপুল পরিমাণ জব্দকৃত মাল কোথায় গেলো? কে বা কারা এগুলো কিভাবে সরিয়ে ফেলেছে? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর না পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট শিল্পনগরী কর্মকর্তার কাছে প্রাপ্ত ১২৩ টি প্যাকেট জিম্মায় রেখে তার প্রত্যায়ন নিয়ে আদালতকে প্রদান করেন।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গেলে এ বিষয়ে শিল্পনগরী কর্মকর্তা মশিয়ার রহমান বলেন, আমি প্রায়ই গোডাউনের গেট চেক করি। তাছাড়া পুরো শিল্পনগরী আমার তদারকিতে থাকলেও গোডাউন বা কারখানার দায়িত্ব মূলতঃ সংশ্লিষ্ট মালিকের। আমি নিজেই জানিনা এমন কিছু ঘটেছে। কিন্তু তালা খুলে এমন দৃশ্য দেখে চমকে গেছি। তবে গোডাউনের ভিতরের দিকের দেওয়ালে একটা জায়গায় নতুন করে প্লাস্টার করার চিহ্ণ দেখা গেছে। হয়তো সেখান দিয়েই মালগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমরা কেউ টের পাইনি। হয়তো মালগুলোর মালিক বা গোডাউন মালিক এই কাজ করে থাকতে পারেন।
যদিও আমাদের একজন নাইটগার্ড আছেন। তিনি গেটে অবস্থান করেন। গোডাউনে বা কোন কারখানায় পাহাড়া দেওয়ার দায়িত্ব তার নয়। তবে এটা দেখার দায়িত্ব ছিল উপজেলা কৃষি অফিসারের। কারণ তিনিই এই মামলার বাদি ও তার কাছেই শীলগালাকৃত তালার চাবি আছে। তাছাড়া প্রায় প্রতিদিনই থানা থেকে পুলিশ এসে দেখে যান। আগে এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই আঙ্গুর আর এখন এসআই ঋষিকেশ। এখন এটা যেহেতু ম্যাজিষ্ট্রেট এসে দেখেছেন তারা আদালতে জানানোর পর আদালতই সিদ্ধান্ত নিবেন পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভুষণ বলেন, আমি মামলার বাদি হওয়ায় আমার কাছে চাবি দেওয়া হয়েছে। ওই চাবি আজও শীলগালাকৃতভাবে আমার ড্রোয়ারে রক্ষিত আছে। কিন্তু আমি কখনই ওই গোডাউনের তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত নই এবং ঘটনার পর থেকে একদিনও সেখানে যাইনি। বরং সেটি দেখাশোনার প্রধান দায়িত্ব শিল্পনগরী কর্মকর্তা ও পুলিশের। শীলাগালা করার সময় আমি ৯৯ মেট্রিক টন মালামাল দেখেছি। এখন সেখান থেকে কিভাবে সেগুলো উধাও হয়েছে তা আমার জানা নাই। তাছাড়া গতকাল যে, আদালতের নির্দেশে ম্যাজিষ্ট্রেট এসে তালা খুলে মাল না পেয়ে ফিরে গেছেন তাও আমি জানিনা। কেননা তারা আমাকে এ বিষয়ে জানাননি।
জব্দকৃত মালামালের মালিক সৈয়দপুর শহরের রংপুর রোডস্থ মেসার্স মনোয়ার ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. মনোয়ার হোসেন সরকার বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। ঘটনার পর পুলিশ নিষেধ করেছে যেন আমি কখনই ওই বিসিক শিল্পনগরীতে না যাই। গেলে আলামত নষ্ট করার অভিযোগে গ্রেফতার করলে আর কখনো জামিন মিলবেনা। অথচ মালগুলো আমার বৈধ এবং কোম্পানী থেকে ক্রয়কৃত। আমি দীর্ঘ ৩৩ বছর থেকে এসিআই কোম্পানীর সম্মানিত ডিলার হিসেবে ব্যবসা করে আসছি। আমার মালের মেয়াদ তখনও প্রায় ২ বছর ছিল। কিন্তু সরকার তা নিষিদ্ধ করেছে কোম্পানীকে বিক্রি না করতে। তবে নিষিদ্ধ করার আগেই মালগুলো কেনা। তাই এগুলো নিষিদ্ধ বা জব্দ করার আগে আমার টাকা আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া আইনগত অধিকার আছে আমার। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাই এখনও আদালতের রায়ের অপেক্ষায় আছি।
তিনি আরও বলেন, সেই সময় সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান লেলিনের নেতৃত্বে তামিম রহমান ও আরও একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এসে আমার মালগুলো নিষিদ্ধ বলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। নয়তো প্রশাসনকে দিয়ে ধরিয়ে দিবেন বলে হুমকি দেন। আমি তাদের কথায় সম্মত না হওয়ায় ক্ষমতার দাপটে এবং আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত বলে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আমার মালগুলো আটক করেছেন। তাদের সহযোগিতা করেছেন তৎকালীন এসিল্যান্ড বা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট। কারণ আমি মালামাল ক্রয়ের সকল কাগজপত্র দেখালেও তারা মাল জব্দ করে গোডাউন শীলগালা করেন এবং আমাকে গ্রেফতার করেন। অথচ মামলা দিয়েছেন চোরাচালানির। আমি এর বিচার চাই এবং আমার মালামাল ফেরত অথবা ক্ষতিপূরণ চাই।






















