নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার ৬ নম্বর কিশোরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোছা. মালেকা বেগমের দাপ্তরিক কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের প্রায় এক হাজার নাগরিকের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, নির্বাচন প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের রিসিভ কপিও সংরক্ষণ করেছেন অভিযোগকারীরা।
পূর্ববর্তী নির্বাচিত চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (গ্রেনেড বাবু) অপসারণের পর প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে মোছা. মালেকা বেগমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মালেকা বেগম দাপ্তরিক কাগজপত্র পড়তে ও বুঝতে পারেন না। কোনো নথিতে স্বাক্ষরের আগে পরিষদের সদস্য, স্বামী কিংবা সন্তানরা তাকে কাগজপত্র পড়ে শোনান। এরপর তিনি তাতে স্বাক্ষর করেন। এতে নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত তথ্য ও দাপ্তরিক নথির গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে ক্যামেরার সামনে মালেকা বেগমকে একটি কাগজ পড়ে শোনাতে বলা হয়। তার সামনে থাকা কাগজটি কী, তা তিনি পড়ে বলতে পারেননি। এ সময় পাশে থাকা ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম মাওলা কাগজটি দেখে সেটিকে ‘ওয়ারিশনামা’ বা ‘ওয়ারিশ সনদ’ বলে উল্লেখ করেন।
একইভাবে, ক্যামেরার সামনে একটি ওয়ারিশ সনদপত্র দেখিয়ে তাতে কী লেখা রয়েছে এবং কোন কাগজে তিনি স্বাক্ষর করছেন—জানতে চাইলে মালেকা বেগম নিজে তা পড়ে বা ব্যাখ্যা করতে পারেননি। তবে এ পর্যবেক্ষণ তার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা সামগ্রিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোছা. মালেকা বেগম বলেন, পরিষদের সদস্য, তার স্বামী ও সন্তানদের কাছ থেকে কাগজপত্র পড়ে শুনে ও বুঝে তিনি স্বাক্ষর করেন। দাপ্তরিক নথি বোঝার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য ও পরিষদের সদস্যদের কাছ থেকে তিনি সহায়তা নেন বলেও জানান।
ক্যামেরার সামনে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. গোলাম মাওলা বলেন, একজন দুর্নীতিবাজ সাবেক চেয়ারম্যানের সঙ্গে না থেকে একজন অশিক্ষিত নারী চেয়ারম্যানের সঙ্গে থেকে পরিষদ ভালোভাবে চালানো যাবে—এমন চিন্তা থেকেই মালেকা বেগমকে প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তার ভাষ্য, “ওনাকে দিয়ে আমরা পরিষদ চালাতে পারব”—এই ধারণা থেকেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোশারফ হোসেন বলেন, বর্তমান প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কোনো বই-পত্র পড়তে পারেন না। কোনো কাগজপত্র এলে অন্যের কাছ থেকে শুনে নিয়ে তিনি স্বাক্ষর করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি বিতরণ করা চালের হিসাব চাইতে গেলে মালেকা বেগম “ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হতে আমার ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে, আমি কোনো হিসাব দিতে পারব না”—এমন কথা বলেছেন বলেও দাবি করেন মোশারফ হোসেন। তবে ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের এই দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি সত্য হলে তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন আরও বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের জন্য একজন যোগ্য ও শিক্ষিত ব্যক্তির প্রয়োজন। তার দাবি, মালেকা বেগম স্বাক্ষর ছাড়া তারিখ লেখার বিষয়টিও ঠিকমতো জানেন না। এ বিষয়ে তিনি প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ইউনিয়নের স্থানীয় নাগরিক কামরুল হক বলেন, “তিনি কিছুই জানেন না। তাকে প্যানেল চেয়ারম্যান বানানো হলো কেন?”
৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. আব্দুর রউফ বলেন, “মালেকা বেগমের লেখাপড়া নেই। কাগজও বোঝেন না। অন্যের কাছে পড়ে নিয়ে তারপর স্বাক্ষর করেন।”
২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দুলাল ইসলাম বলেন, “আমাদের ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মালেকা বেগম লিখতে, পড়তে ও বুঝতে পারেন না। আমরা এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আবেদন করেছি। দ্রুত তাকে অপসারণ করে একজন সুশিক্ষিত ও যোগ্য ব্যক্তিকে ওই পদে বসানোর দাবি জানাই।”
অভিযোগের বিষয়ে নবনিযুক্ত নীলফামারী জেলা প্রশাসক মো. হুমায়ূন কবির বলেন, “বিষয়টি এইমাত্র আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। আমার দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগ হাতে পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, তিনি অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিনি ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
প্রায় এক হাজার নাগরিকের লিখিত অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য এবং ক্যামেরার সামনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাগজ পড়তে না পারার বিষয়টি এখন প্রশাসনিক তদন্তের অপেক্ষায়। অভিযোগের সত্যতা কতটা এবং পূর্ববর্তী নির্বাচিত চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে অপসারণের পর মোছা. মালেকা বেগমকে প্যানেল ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া যথাযথ ছিল কি না—তদন্তেই তার উত্তর মিলবে।
নাগরিকদের প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এবং ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা স্বচ্ছ, কার্যকর ও হয়রানিমুক্ত করা হবে।


























