স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলতে সাংবাদিকতা পেশার জন্য অভিন্ন আচরণবিধি প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা। তবে এ আচরণবিধি সরকার কর্তৃক চাপিয়ে না দিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক, মালিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
রবিবার (৮ নভেম্বর) রংপুরে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) আয়োজনে বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
সভায় বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতিমালা, ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং পাঠক-দর্শকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে পেশাগত ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।
সভায় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নেরও দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সামগ্রিক কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। এ জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে ধাপে ধাপে সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হবে।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যত কার্যকর হবে, সংবাদমাধ্যমে বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগ তত কমবে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পাঠক-দর্শকের আস্থার ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আস্থা ধরে রাখতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিজেদের জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি সাংবাদিকদের পাশাপাশি সম্পাদক ও মালিকদের জন্য পৃথক আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। সংবাদমাধ্যম সংস্কারে এমআরডিআইয়ের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা (২০২৫-২০৩০)-এর অংশ হিসেবে স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো সাংবাদিক, মালিক, সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে এসব সুপারিশের প্রতি সমর্থন এসেছে। তাই এগুলো বাস্তবায়নে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকার বাস্তবায়ন না করলে কেন করছে না এবং কোথায় বাধা রয়েছে, তা স্পষ্ট করা উচিত।
অভিন্ন আচরণবিধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়; বরং সাংবাদিক, সম্পাদক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি আচরণবিধি কার্যকর করতে জবাবদিহি ও প্রতিকারের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, একজন ভালো সাংবাদিক সরকার কিংবা মালিক তৈরি করে দেবে না। সম্পাদক, নিউজরুমের দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং সাংবাদিকদের নিজেদেরই পেশাগত মান উন্নয়নে কাজ করতে হবে। সরকার ও মালিকপক্ষের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি নিজেদের উন্নয়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষা, ভুলের সংশোধন, পাঠক-দর্শকের অভিযোগের প্রতিকার এবং পেশাগত মান উন্নয়নের দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমগুলোকেই নিতে হবে। এসব উদ্যোগের জন্য সব সময় বাইরের কারও ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
সভায় সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ ও পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নৈতিক সাংবাদিকতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তা অপরিহার্য। এ জন্য সময়মতো বেতন প্রদান, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, সরকার, মালিকপক্ষ, বিজ্ঞাপনদাতা ও রাজনৈতিক পক্ষের চাপ প্রতিরোধে শক্তিশালী ও স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতিমালা এবং কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে গণমাধ্যম সংস্কার ও স্ব-নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় ঢাকার বাইরের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এমআরডিআইয়ের ধারাবাহিক বিভাগীয় মতবিনিময় সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার সংবাদমাধ্যমের মালিক, প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামের পর এটি ছিল এমআরডিআইয়ের পঞ্চম বিভাগীয় আয়োজন। হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশ-এর অর্থায়নে কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভসের (সিএফএলআই) আওতায় কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভায় আরও বক্তব্য দেন দৈনিক যুগের আলোর প্রকাশক ও সম্পাদক মমতাজ শিরীন ভরসা, দৈনিক প্রথম খবরের সম্পাদক আব্দুল বারী তোতা, দৈনিক দাবানলের সম্পাদক খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার, আমাদের প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহবুব রহমান, দৈনিক বায়ান্নর আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাজিদুল ইসলাম লাল, দৈনিক মায়াবাজারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সুশান্ত ভৌমিক, আগামীর সন্ধানের সম্পাদক মোনাব্বর হোসেন মনা, আরএনবি নিউজের সম্পাদক লিয়াকত আলী বাদল, রংপুর সিটি প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন চৌধুরী, রংপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মাহফুজ আলম প্রিন্স, রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান সালেক, সীডের নির্বাহী পরিচালক সারথী রানী সাহা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তাবিউর রহমান প্রধান, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. নজরুল ইসলাম, লালমনিরহাট বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক ড. এস. এম. শফিকুল ইসলাম কানু, আজকের দেশ বার্তার সম্পাদক চিত্ত ঘোষ, দৈনিক আলাপনের সম্পাদক ও প্রকাশক আমিনুল হক, দৈনিক নীলফামারী বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক মো. শীষ রহমান, দৈনিক মাধুকরের সম্পাদক কে এম রেজাউল হক, অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী এবং উদয়াঙ্কুর সেবা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ভুবন চন্দ্র রায়।






















