নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং শেষে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করেছে ভারত থেকে আমদানি করা আধুনিক ১৮টি এলএইচবি (লিংকে-হফম্যান-বুশ) ব্রডগেজ রেলকোচ।
রবিবার (৮ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে কারখানা থেকে পঞ্চগড়ের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে কোচগুলোর বহর। বিকেল সাড়ে ৪টায় সেটি পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়। সেখানে অবস্থান নেওয়ার পর কোচগুলো আবার সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ফিরিয়ে আনা হয়।
আগামী ১৯ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা রুটে ‘পাবনা প্রভাতী’ ও ‘পাবনা গোধূলী’ নামে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন উদ্বোধনের জন্য এসব কোচ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রবিবার বেলা ১১টার দিকে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা থেকে প্রয়োজনীয় লোকোমোটিভ ও সংশ্লিষ্ট ক্রুদের সহায়তায় কোচগুলোর পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হয়। সৈয়দপুর-পার্বতীপুর-দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রেলপথে চলাচলের সময় বিভিন্ন কারিগরি বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। পথে কাঞ্চন কার্ভ এলাকায় ট্রেন থামিয়ে ব্রেকসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য বিষয় তদারকি করা হয়। নির্ধারিত যাত্রা শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কোচগুলো পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে সেগুলো পুনরায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১৭ অক্টোবর ভোর ৪টার দিকে ভারত থেকে প্রথম চালানে আসা ১৮টি রেলকোচ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পৌঁছায়। এরপর কারখানায় কোচগুলোর বিশেষ ডিপ্রিজারভেশন, যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এসব কাজে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের বিশেষজ্ঞরাও অংশ নেন।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্বাবধায়ক (ডিএস) শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘কারখানায় আনা কোচগুলো বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। এ কাজে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ভারতের বিশেষজ্ঞরা ২০ সদস্যের একটি টিমও কাজ করেছেন।
তিনি আরও বলেন, রবিবার বেলা ১১টার দিকে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারাখানা থেকে পঞ্চগড় রেলস্টেশন পর্যন্ত কোচগুলোর প্রথম ট্রায়াল রান অনুষ্ঠিত হয়। কোনো ধরণের ত্রুটি ছাড়াই ট্রায়াল রান সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে। পরীক্ষামূলক চলাচলের পর কোচগুলো কারখানায় ফিরিয়ে আনা হয়। পরে তা রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের ট্রাফিক বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
তিনি জানান, ১৮টি কোচের মধ্য থেকে ১২টি কোচ নিয়ে একটি রেক প্রস্তুত করা হবে আগামী ১৯ নভেম্বর পাবনা-ঢাকা রুটের নতুন ট্রেনের জন্য।
রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আগামী ১৯ নভেম্বর পাবনা রেলওয়ে স্টেশনে সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পাবনা প্রভাতী’ ও ‘পাবনা গোধূলী’ নামে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন উদ্বোধন করবেন বলে পরিকল্পনা রয়েছে।
সকাল ৮টায় পাবনা থেকে ৮০৮ নম্বর ‘পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস’ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। এরপর বিকাল ৩টা ২৫ মিনিটে সেই ট্রেনটি ৮০৭ নম্বর ‘পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস’ ঢাকা থেকে পাবনার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। ট্রেন দুটি পরিচালনার জন্য ভারত থেকে আসা ১৮টি কোচের মধ্য থেকে ১২টি কোচ নিয়ে একটি রেক প্রস্তুত করা হবে।
সূত্রে আরো জানা যায়, ভারত থেকে আমদানি করা এসব কোচ আধুনিক এলএইচবি প্রযুক্তির ব্রডগেজ কোচ। ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুসারে তৈরি কোচগুলোতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আরামদায়ক ভ্রমণের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় একটি কোচের ওপর অন্য কোচ উঠে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে এতে অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক ও অ্যান্টি-ক্লাইম্বিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
পুরোনো স্ক্রু কাপলিং ব্যবস্থার পরিবর্তে কোচগুলোতে রয়েছে আধুনিক সেন্টার বাফার কাপলিং (সিবিসি) ব্যবস্থা। এতে কোচগুলোর সংযোগ আরও মজবুত হবে এবং চলাচলের সময় ঝাঁকুনি কমবে। এ ছাড়া রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা, প্যাসেঞ্জার অ্যালার্ম সিস্টেম, অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম ও জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা।
যাত্রীদের সুবিধার জন্য কোচগুলোতে রয়েছে শিশু পরিচর্যার আলাদা বেবি কেয়ার রুম ও নামাজ আদায়ের স্থান। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বায়ো-টয়লেট, ইলেকট্রো-নিউম্যাটিক চাপযুক্ত ফ্লাশিং ব্যবস্থা, একাধিকা অবস্থানে হেলানো যায় এমন বিশেষ আসন, স্টেইনলেস স্টিলের হাতল ও পায়ের বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আধুনিক অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও ফোল্ডিং সুবিধাযুক্ত আসনও রয়েছে। বাংলাদেশের রেলওয়ের পরিচালনব্যবস্থা বিবেচনায় কোচগুলোর ছাদ কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। এগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী করে তৈরি।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহের চুক্তির আওতায় ভারত থেকে প্রথম চালানে ১৮টি কোচ পাঠানো হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালায় অবস্থিত রেল কোচ ফ্যাক্টরি থেকে কোচগুলো বাংলাদেশের উদ্দেশে পাঠানো হয়। পরে গেদে-দর্শনা আন্তদেশীয় রেল সংযোগ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সেগুলো সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় আনা হয়।
ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রেল ইন্ডিয়া টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক সার্ভিসেস লিমিটেডের (রাইটস) সঙ্গে ২০২৪ সালের ২০ মে বাংলাদেশ রেলওয়ের ২০০টি এলএইচবি ব্রডগেজ কোচ সরবরাহের চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ৯ অক্টোবরের মধ্যে এসব কোচ সরবরাহ, পরীক্ষণ ও চালুর কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রথম চালানের ১৮টি কোচের মধ্যে রয়েছে ১১টি নন-এসি শোভন চেয়ার কার, তিনটি এসি চেয়ার কার, দুটি এসি স্লিপার কার এবং দুটি এসি পাওয়ার কার। পাওয়ার কার দুটিতে গার্ডের কক্ষ ও মালপত্র রাখার জায়গা রয়েছে। কোচগুলোর কাঠামোতে স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কোচ সরবরাহের ভিত্তিতে ঢাকা-পাবনা ও ঢাকা-খুলনা ব্রডগেজ রুটে দুটি নতুন আন্তনগর ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যমুনা সেতু-পাবনা, ঢাকা-পদ্মা সেতু এবং খুলনা-মোংলা রেলপথসহ নতুন কয়েকটি রেলপথ চালু হলেও ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের সংকটের কারণে পর্যাপ্ত ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। ভারত থেকে ২০০টি কোচ সরবরাহ সম্পন্ন হলে নতুন ট্রেন চালুর পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে গতি আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।



















